শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই জন্ম নিয়েছিলেন দুই ভাই জয়নাল সরদার (৩১) ও রাসেল সরদার (৩০)। জন্মের পর থেকেই তাদের জীবন ছিল প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট ও পারিবারিক নানা দুর্ভোগের মধ্যেও শিক্ষার আলোয় নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও চাকরির দেখা না মেলায় আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে দুই ভাইয়ের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার সামন্তসার ইউনিয়নের লাকাচুয়া এলাকার আব্দুস সামাদ সরদার ও রাবেয়া বেগম দম্পতির ছেলে জয়নাল ও রাসেল। ছোটবেলাতেই তাদের জীবনে নেমে আসে বড় এক শোক। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার আগেই মারা যান মা রাবেয়া বেগম। মায়ের মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা চিন্তাও করেননি বাবা আব্দুস সামাদ সরদার। দুই ছেলেকে মানুষ করাই হয়ে ওঠে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে হাঁটাচলায় অনেকটাই অক্ষম দুই ভাই। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব বেশি হওয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নানা ও খালার বাড়িতে থাকতে হয়েছে তাদের। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান তারা।
আরও পড়ুনজন্মান্ধ রাজুর চোখে আলো না থাকলেও স্বপ্ন অনেক
অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিবারের সহযোগিতায় জয়নাল ও রাসেল ২০১২ সালে সামন্তসার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ২০১৪ সালে সরকারি সামসুর রহমান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। একই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক ডিগ্রিও অর্জন করেন তারা। তবে শিক্ষাজীবনের সফলতা কর্মজীবনে লাগাতে পারেননি দুই ভাই। দীর্ঘদিন ধরেও কোনো চাকরির সুযোগ পাননি তারা। ফলে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন ছোট ভাই রাসেল। বর্তমানে তিনি ঢাকার মিরপুরে ফুটপাতে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সামান্য আয়ে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও দুই ভাই যে অধ্যবসায় ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণার। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ায় হতাশ পরিবার ও এলাকাবাসী। তাদের দাবি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী কোটায় উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে জয়নাল ও রাসেলের মতো মেধাবী ও সংগ্রামী তরুণরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা নাঈম বলেন, জয়নাল ও রাসেল ভাই জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। অনেক মানুষ রয়েছে যারা স্বাভাবিক এবং সুস্থ তবুও তারা পড়াশোনা করতে চায় না। তবে এই দুই ভাই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও অনেক স্ট্রাগল করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। এত কষ্টের পরও তারা কোনো চাকরি পায়নি। তারা সমাজের বোঝাই হয়ে আছে। সরকার এবং সমাজের বিত্তশালীদের উচিত ছিল এই দুই ভাইকে স্বাবলম্বী করে তোলা।
আরও পড়ুনযে বয়সে ছেলের হাত ধরে হাঁটার কথা সে বয়সে করছেন বাঁচার লড়াই
জয়নাল ও রাসেলের বাবা আব্দুস সামাদ সরদার বলেন, আমার ছেলে দুটি জন্ম থেকে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। ওদের বড় করতে এবং পড়াশোনা করাতে আমার অনেক বেগ পেতে হয়েছে। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর শুধু ওদের দুই ভাইয়ের কথা চিন্তা করে ঢাকায় গিয়ে ছোট একটি চাকরি করে ওদের পড়াশোনা করিয়েছি। ভেবেছিলাম যেহেতু ওরা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, তাই পড়াশোনা শেষ করলে ওরা চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে। আমি এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছি, কাজ করতে পারি না। আমার এমন কোনো জমিজমাও নেই যা বিক্রি করে ওদেরকে স্বাবলম্বী করব। জায়গা জমি যা ছিল বিক্রি করে ওদেরকে পড়াশোনা করিয়েছি। এখন সরকার যদি ওদের দিকে দৃষ্টি না দেয়, আমি মারা যাওয়ার পর ওদেরকে কে দেখবে।
রাসেল বলেন, আমরা দুই ভাই অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। ভেবেছিলাম সরকার আমাদের দিকে দৃষ্টি দিবে। তবে সরকার যায়, সরকার আসে আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা একটা চাকরি পাই না। সবাই আমাদের আশা দেখায়, কিন্তু কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয় না। আমি ঢাকায় ছোট একটা চায়ের দোকান করি ফুটপাতে। সেটাও মাঝেমধ্যে প্রশাসন এসে ভেঙে দেয়। আমি যেটুকু আয় করি তাই দিয়ে আমাদের পুরো সংসার চলে। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি বা কর্ম দিক। যাতে আমরা মাথা উঁচু করে সমাজের বোঝা না হয়ে বেঁচে থাকতে পারি।
আরও পড়ুনঘরের অভাবে দিশাহারা প্রতিবন্ধী দম্পতির উদ্বাস্তু জীবন
এ ব্যাপারে সামন্তসার ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের হাওলাদার বলেন, আমার ইউনিয়নে দুই ভাই জয়নাল ও রাসেল শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়েও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। তবে তারা এখনো কোনো চাকরি পায়নি। আমরা সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছি, তবে তা সামান্য কিছু ভাতা। আমি চাই সরকার যেন এই ছেলে দুটির একটি চাকরি ব্যবস্থা করে দেয়।
বিষয়টি নিয়ে জেলা সমাজসেবার উপ-পরিচালক এস.এম. আনোয়ারুল করিম বলেন, আমরা বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখব। সরকারিভাবে তাদের যেটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব আমরা করবো।
বিধান মজুমদার অনি/এফএ/এএসএম