বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। এমনটিই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের নিম্নগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট এখনো অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট।
তবে সরকার যেসব ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর ফল পেতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। বিনিয়োগ বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানি ও মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাস, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন।
জাগো নিউজ : বর্তমান সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস পার করছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. মোস্তাফিজুর রহমান : সামগ্রিকভাবে বললে, সরকার বেশকিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব বিষয় বলা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাজেটেও বিনিয়োগবান্ধব বেশকিছু রাজস্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব রয়েছে। যেমন—বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা আরও বিস্তৃত করা, ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার ক্ষেত্রে উদ্যোগ এবং সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ।
আমরা যদি ঘোষণা দিয়ে বলি যে, নতুন কোনো শিল্পকারখানায় এখন গ্যাসের সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে বিনিয়োগকারীরা কেন এখানে বিনিয়োগ করবে? সুতরাং এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে
তবে সমস্যা হচ্ছে, সরকার যে পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এসব এখনো অব্যাহত রয়েছে।
জাগো নিউজ : অর্থাৎ, ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে এখনো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না?
ড. মোস্তাফিজুর রহমান : ঠিক তা-ই। অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর যে অবনমন আমরা লক্ষ্য করছিলাম, সেই পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জ এখনো কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে।
আরও পড়ুনপ্রধানমন্ত্রী / একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়
বিশেষ করে জ্বালানি পরিস্থিতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে উদ্যোগ ও উদ্যমের জায়গায় ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ থাকলেও অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে পুঞ্জীভূত সমস্যা এখনো রয়েছে।
তবে সরকার যে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, সেগুলোর ফলশ্রুতিতে অর্থনীতির চলমান পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে কি না, সেটি দেখার জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
জাগো নিউজ: বিনিয়োগ এখন বড় একটি বাধা। বিনিয়োগ বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার?
ড. মোস্তাফিজুর রহমান : বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই জ্বালানি সংকট দূর করতে হবে। কারণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কে বিনিয়োগ করবে? আমরা যদি ঘোষণা দিয়ে বলি যে, নতুন কোনো শিল্পকারখানায় এখন গ্যাসের সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে বিনিয়োগকারীরা কেন এখানে বিনিয়োগ করবে? সুতরাং এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
সরকার ফ্রি ট্রেড জোন, স্পেশাল ইকোনমিক জোন, মাতারবাড়ীর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে অনেক সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সেবার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর যে অবনমন আমরা লক্ষ্য করছিলাম, সেই পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জ এখনো কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে
এগুলো কার্যকর হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। কিন্তু এগুলো কার্যকর করতে হলে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মানসম্মত বিদ্যুৎ এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাগো নিউজ : জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
ড. মোস্তাফিজুর রহমান : স্বল্পমেয়াদে আমাদের আমদানি করে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে হবে। আর মধ্যমেয়াদে বাপেক্সকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি) আরও সক্রিয় করে অনশোর, অফশোর ও নিয়ারশোর এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও খনন বাড়াতে হবে।
আরও পড়ুনজ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে সরকার আগ্রহী: মন্ত্রী
এখন আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ভাসমান জাহাজ টার্মিনাল করার যে চিন্তাভাবনা রয়েছে, সেগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
জাগো নিউজ : বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও কি গুরুত্বপূর্ণ?
ড. মোস্তাফিজুর রহমান : অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিকটিও দেখতে হবে। বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানেও কিছু উদ্যোগ ও সংস্কার হচ্ছে। বিডা, পিপিপিসহ বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করার জন্য সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা যেন দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা দিলেই হবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দ্রুত সরকারি সেবা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
এমএএস/এমকেআর/ এমএফএ