একটি মিথ্যা সবসময় মিথ্যার পোশাক পরে আসে না। অনেক সময় সে আসে সত্যের ভাষায়, তথ্যের সাজে, যুক্তির ভঙ্গিতে। তার হাতে থাকে কিছু সত্য ঘটনা, মুখে থাকে কিছু সঠিক পরিসংখ্যান, আর বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এমন এক বিকৃতি, যা শেষ পর্যন্ত সত্যকেই বিভ্রান্ত করে। আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যাগুলো তাই সরাসরি মিথ্যা নয়; তারা সত্যের পোশাক পরা মিথ্যা।
নগ্ন সত্যকে চেনা সহজ। সে অস্বস্তিকর হতে পারে, কঠিন হতে পারে, কখনো কখনো নির্মমও হতে পারে—কিন্তু তার শরীরে কোনো আবরণ থাকে না। সত্য বললে ক্ষমতাবান অস্বস্তিতে পড়তে পারেন, জনপ্রিয় ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, নিজের ভুলও স্বীকার করতে হতে পারে। তাই মানুষ অনেক সময় সত্যকে পছন্দ করে না। সত্যের চেয়ে আরামদায়ক মিথ্যাকে বেছে নেয়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মিথ্যা নিজেকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শেখে। আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়। সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, পডকাস্ট, ব্লগ, মন্তব্য—প্রতিমুহূর্তে মানুষের সামনে অসংখ্য বক্তব্য এসে হাজির হচ্ছে। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই সত্য বাড়ে না। বরং তথ্যের এই বিপুল ভিড়ের মধ্যে সত্যকে আড়াল করা আরও সহজ হয়ে যায়।
একটি মিথ্যা খবর হয়তো সম্পূর্ণ বানানো। সেটি যাচাই করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু কোনো একটি সত্য ঘটনা থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে, কিছু অংশ বাদ দিয়ে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলে তা অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ সেখানে পাঠক সত্যের কিছু অংশ দেখতে পান। আর সেই আংশিক সত্যই পুরো মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
আমাদের সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্যের নয়, বিবেকের। একটি খবর শেয়ার করার আগে এক মুহূর্ত থামা। একটি অভিযোগ বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খোঁজা। কোনো মানুষের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার আগে তার বক্তব্য শোনা। নিজের রাজনৈতিক পক্ষের ভুলকে ভুল বলা। নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্যকেও অন্তত শুনতে শেখা।
সত্যকে বিকৃত করার এই কৌশল নতুন নয়। রাজনীতির ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে। ক্ষমতাবানরা কখনো কখনো সত্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন না; বরং সত্যের ব্যাখ্যাকে নিজেদের সুবিধামতো নির্মাণ করেন। একটি ঘটনা ঘটেছে—এটি সত্য। কিন্তু কেন ঘটেছে, কার দায়, তার প্রেক্ষাপট কী—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলে দিলে একই ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
এখানেই নগ্ন সত্য ও সত্যের পোশাকে মিথ্যার পার্থক্য। নগ্ন সত্য বলে—ঘটনা ঘটেছে। সত্যের পোশাকে মিথ্যা বলে—ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এর অর্থ শুধু সেটিই, যা আমি বলছি। এই ‘শুধু’ শব্দটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
একটি পরিসংখ্যান সত্য হতে পারে। কিন্তু সেই পরিসংখ্যান দিয়ে যদি বৃহত্তর বাস্তবতার একটি অংশকে আড়াল করা হয়, তবে তা সত্যের অপব্যবহার। একটি গবেষণার ফল সত্য হতে পারে। কিন্তু গবেষণার সীমাবদ্ধতা গোপন করে সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। একটি ছবি সত্য হতে পারে। কিন্তু ছবিটির সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট বদলে দিলে সেই সত্যই মিথ্যার বাহন হয়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। আগে একটি মিথ্যা ছড়াতে সময় লাগত। এখন একটি মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। কেউ একটি বক্তব্য লিখলেন, সঙ্গে একটি ছবি দিলেন, কয়েকটি উত্তেজনাপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করলেন—মুহূর্তের মধ্যে তা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। পাঠক সাধারণত পুরো ঘটনা যাচাই করেন না; তিনি শিরোনাম দেখেন, নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে নেন এবং শেয়ার করেন।
মানুষ অনেক সময় সত্য খোঁজে না; নিজের বিশ্বাসের প্রমাণ খোঁজে। এ কারণেই একই ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষ দুই ধরনের ‘সত্য’ নির্মাণ করে। প্রত্যেকে নিজের পছন্দের তথ্য গ্রহণ করে, অপছন্দের তথ্য প্রত্যাখ্যান করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও মানুষকে এমন তথ্যই বেশি দেখায়, যা তার আগের মতামতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক তথ্য-বুদবুদের মধ্যে বসবাস করতে শুরু করে, যেখানে নিজের বিশ্বাসই একমাত্র সত্য বলে মনে হয়।
এই পরিস্থিতিতে মিথ্যার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সে মানুষের পূর্বধারণাকে ব্যবহার করে। যে মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলকে অপছন্দ করেন, তিনি সেই দলের বিরুদ্ধে প্রচারিত যেকোনো তথ্য সহজেই বিশ্বাস করতে পারেন। যে মানুষ কোনো গোষ্ঠীকে সন্দেহ করেন, সেই গোষ্ঠীকে নিয়ে ছড়ানো গুজব তাঁর কাছে দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। যে মানুষ কোনো নেতাকে অন্ধভাবে সমর্থন করেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগও তিনি ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিতে পারেন।
এখানে সত্য পরাজিত হয় তথ্যের অভাবে নয়; মানুষের পক্ষপাতের কাছে। রাজনীতিতে সত্যের পোশাকে মিথ্যার ব্যবহার সবচেয়ে দৃশ্যমান। একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের সাফল্যের কথা বলবে, ব্যর্থতা এড়িয়ে যাবে। বিরোধী দল ব্যর্থতার কথা বলবে, সাফল্য অস্বীকার করবে।
উভয় পক্ষই কিছু সত্য বলবে, কিন্তু পুরো সত্য বলবে না। কিন্তু অর্ধসত্যও অনেক সময় মিথ্যার চেয়ে কম বিপজ্জনক নয়। কারণ সম্পূর্ণ মিথ্যাকে প্রতিহত করা যায়। কিন্তু অর্ধসত্য মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে, বাস্তবতাকে অস্পষ্ট করে এবং সমাজকে বিভক্ত করে। একটি ঘটনা সম্পর্কে যদি মানুষ পাঁচটি ভিন্ন ব্যাখ্যা পায়, কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য না পায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে জোরে বলা কথাটিই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সত্য তখন যুক্তির শক্তিতে নয়, প্রচারের শক্তিতে জয়ী হয়।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার মূল কাজ শুধু তথ্য পরিবেশন নয়; তথ্যের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা। একটি সংখ্যা কোথা থেকে এসেছে, কোন সময়ের, কীভাবে সংগৃহীত—এসব জানানো জরুরি। একটি বক্তব্য কে বলেছেন, কেন বলেছেন এবং তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ কী—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ‘কে কী বললেন’ সংবাদ নয়। ‘তিনি যা বললেন, তা কতটা সত্য’—এই প্রশ্নও সাংবাদিকতার অংশ। তবে গণমাধ্যমের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হলে সমস্যাটি আরও গভীর হয়। মানুষ যখন মনে করে প্রতিটি সংবাদমাধ্যম কোনো না কোনো পক্ষের, তখন সত্য যাচাইয়ের বদলে মানুষ নিজের পছন্দের মাধ্যম বেছে নেয়। ফলে সংবাদ আর তথ্যের উৎস থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ।
এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত—স্বচ্ছতা, তথ্যের উৎস, প্রেক্ষাপট এবং ভুল হলে সংশোধনের সাহস। সত্য কখনো কখনো অসম্পূর্ণও হতে পারে। একজন সাংবাদিক ভুল করতে পারেন। একজন গবেষক ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। একটি প্রতিষ্ঠান ভুল তথ্য দিতে পারে। কিন্তু ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা সত্যের শক্তিকে কমায় না; বরং বাড়ায়।
মিথ্যার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে নিজেকে সংশোধন করতে চায় না। কারণ মিথ্যা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে রক্ষা করতে আরও মিথ্যা তৈরি করতে হয়। একটি মিথ্যাকে ঢাকতে দ্বিতীয় মিথ্যা, দ্বিতীয়টিকে ঢাকতে তৃতীয় মিথ্যা—এভাবে একটি সম্পূর্ণ কাহিনি তৈরি হয়। একসময় সেই কাহিনি এত বড় হয়ে ওঠে যে, যারা তা তৈরি করেছে তারাও নিজের নির্মিত গল্পের বন্দী হয়ে পড়ে।
ব্যক্তিজীবনেও একই ঘটনা ঘটে। আমরা অনেক সময় নিজের কাছে সত্য গোপন করি। নিজের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করি, ভুল সিদ্ধান্তকে পরিস্থিতির দোষ বলি, অন্যের অন্যায়কে বড় করে দেখি কিন্তু নিজের অন্যায়কে ছোট করে দেখি। নিজের সম্পর্কে আমরা যে গল্পটি বিশ্বাস করতে চাই, সেটিই অনেক সময় আমাদের ‘সত্য’ হয়ে ওঠে।
মানুষের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের সম্পর্কে সত্য স্বীকার করা। কারণ বাইরের মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যতটা সহজ, নিজের ভেতরের মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ততটা নয়। একটি সমাজের নৈতিক শক্তি নির্ভর করে তার সত্য সহ্য করার ক্ষমতার ওপর। যে সমাজ সত্য শুনতে পারে না, সেখানে মিথ্যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়। যে রাষ্ট্র সমালোচনা সহ্য করে না, সেখানে ভুল তথ্য ও গুজব বাড়ে। যে রাজনৈতিক দল নিজের ভুল স্বীকার করে না, সেখানে প্রচার সত্যের জায়গা দখল করে। যে পরিবার শিশুদের প্রশ্ন করতে দেয় না, সেখানে অন্ধ বিশ্বাস জন্ম নেয়।
সত্যের জন্য শুধু সত্য বলা যথেষ্ট নয়; সত্য শোনার সংস্কৃতিও তৈরি করতে হয়। এখানে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, তথ্য যাচাই করতে শেখাতে হবে। কোনো খবর দেখলে উৎস খুঁজে দেখা, একাধিক সূত্র মিলিয়ে দেখা, ছবি ও ভিডিওর প্রেক্ষাপট যাচাই করা, মতামত ও তথ্যের পার্থক্য বোঝা—এসব এখন নাগরিক শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
ডিজিটাল যুগে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ আর বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিক নিরাপত্তার অংশ। একজন মানুষ যদি মিথ্যা তথ্যের কারণে ভুল চিকিৎসা নেন, গুজবের কারণে কাউকে আক্রমণ করেন, রাজনৈতিক বিভ্রান্তির কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন কিংবা সামাজিক বিদ্বেষে কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাহলে তথ্যের ভুল শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না—সমাজেরও ক্ষতি করে। তাই তথ্যের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহারও জরুরি।
তবে এখানে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ‘ভুয়া খবর’ বা ‘মিথ্যা তথ্য’ দমনের নামে যেন সত্যিকারের ভিন্নমত দমন করা না হয়। কোনো বক্তব্য আমাদের অপছন্দ হলেই সেটি মিথ্যা নয়। কোনো সমালোচনা সরকারের বিরুদ্ধে হলেই তা ষড়যন্ত্র নয়। কোনো প্রশ্ন অস্বস্তিকর হলেই তা রাষ্ট্রবিরোধী নয়।
সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব যুক্তির; ক্ষমতার নয়। কারণ ক্ষমতা যখন নিজেকে সত্যের একমাত্র মালিক মনে করে, তখন সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু মিথ্যা নয়—অহংকার।
আমাদের সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্যের নয়, বিবেকের। একটি খবর শেয়ার করার আগে এক মুহূর্ত থামা। একটি অভিযোগ বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ খোঁজা। কোনো মানুষের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার আগে তার বক্তব্য শোনা। নিজের রাজনৈতিক পক্ষের ভুলকে ভুল বলা। নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্যকেও অন্তত শুনতে শেখা। এই ছোট ছোট অভ্যাসই সত্যের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
সত্য সবসময় সুন্দর নয়। সত্য কখনো আমাদের প্রিয় নেতা, প্রিয় প্রতিষ্ঠান, প্রিয় মতবাদ কিংবা নিজের ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সত্যকে গ্রহণ করার সাহস না থাকলে সমাজ শেষ পর্যন্ত এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছে যায়, যেখানে মানুষ সত্যকে নয়, নিজের পছন্দের সংস্করণকে বিশ্বাস করে। আর তখন মিথ্যার জন্য আর আলাদা কোনো মুখোশের প্রয়োজন হয় না।
সে সত্যের পোশাক পরে মানুষের ঘরে ঢোকে। যুক্তির ভাষায় কথা বলে। পরিসংখ্যান দেখায়। ছবি ব্যবহার করে। ইতিহাসের অংশ তুলে ধরে। তারপর ধীরে ধীরে মানুষের বিচারবোধকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। এই কারণেই আমাদের সতর্ক হতে হবে।
নগ্ন সত্যকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সত্য কঠিন হলেও তাকে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু সত্যের পোশাকে মিথ্যা সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ তাকে চিনতে হলে শুধু চোখ খোলা যথেষ্ট নয়—বিবেকও জাগ্রত রাখতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—সে আমাদের স্বস্তি দেয় না, বরং অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। যে সত্য আমাদের বিশ্বাস, স্বার্থ বা অহংকারকে প্রশ্ন করে, তাকে গ্রহণ করা কঠিন; কিন্তু সেই কঠিন সত্যকে ভালোবাসার মধ্যেই মানুষের নৈতিক মুক্তি। মিথ্যা আমাদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, সত্যই পারে আমাদের বাস্তবতার সামনে দাঁড় করাতে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সত্যের কোনো একক মালিক নেই। রাষ্ট্র সত্যের মালিক নয়, সরকার নয়, বিরোধী দল নয়, সংবাদমাধ্যমও নয়। সত্যকে খুঁজে পেতে হয় প্রশ্নের মধ্য দিয়ে, প্রমাণের মধ্য দিয়ে, বিতর্কের মধ্য দিয়ে এবং নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসের মধ্য দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে না; বরং যখন মানুষ সত্যকে চিনেও তাকে অস্বীকার করতে শেখে। কারণ তখন মিথ্যা আর বাইরে থাকে না—সে মানুষের বিবেকের ভেতরে বাসা বাঁধে।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তাই সত্যকে শুধু বলা নয়, সত্যকে চিনে নেওয়া। তথ্যের ভিড়ে প্রেক্ষাপট খোঁজা। শব্দের আড়ালে উদ্দেশ্য বোঝা। অর্ধসত্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিকৃতি শনাক্ত করা। এবং সবচেয়ে কঠিন কাজটি করা—যে সত্য আমাদের পছন্দ নয়, তাকেও সত্য হিসেবে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস অর্জন করা। কারণ সত্যের কোনো পোশাক নেই। পোশাকের প্রয়োজন মিথ্যারই হয়।
আর যে সমাজ সত্যকে তার স্বাভাবিক, নগ্ন রূপে দেখতে শেখে, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত মিথ্যার সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটিও খুলে ফেলতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম