সালাউদ্দীন, দক্ষিণ কোরিয়া
মিডল ক্লাস ফ্যামিলির শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সবসময়ই একটা বড় ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে অন্য অনেক দেশে একবার ভিসা রিজেক্ট হলে যে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়, সেই দিকটি বিবেচনায় নিলে দক্ষিণ কোরিয়া হতে পারে একটি দুর্দান্ত পছন্দ।
বিশেষ করে যারা ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য আসতে চান কিংবা পরবর্তীতে অন্য কোনো উন্নত দেশে মুভ করার কথা ভাবছেন (ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে), তাদের জন্য কোরিয়া অন্যতম সেরা বিকল্প।
আরও পড়ুনপ্রবাসীর জীবনবোধ
তবে শুরুতেই একটি বিষয় মানসিকভাবে সেট করে নেওয়া জরুরি- কোরিয়ায় আপনার আগামী কয়েক বছরের পথচলা সহজ হবে না। এখানকার জীবন বেশ কঠিন এবং আপনাকে প্রচুর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই আসতে হবে। এখানে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই; আপনি যত বেশি হার্ডওয়ার্ক করবেন, সাফল্যের সম্ভাবনা তত বাড়বে।
কেন দক্ষিণ কোরিয়া বেছে নেবেন?১. সাশ্রয়ী টিউশন ফি ও স্কলারশিপ: বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিভিত্তিক ও দ্রুত বর্ধনশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির তুলনায় কোরিয়ায় টিউশন ফি বেশ কম। ভালো একাডেমিক রেজাল্ট থাকলে এখানে চমৎকার সব স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ থাকে, এমনকি অনেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্কলারশিপ পেয়ে থাকেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এক বিশাল অঙ্কের টিউশন ফি বেঁচে যায়।
২. আয় ও ব্যয়ের চমৎকার ভারসাম্য: শুরুর দিকে এখানকার লাইফস্টাইলের সাথে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলেও, নির্দিষ্ট সময় পর কোরিয়ায় আয়-ব্যয়ের চমৎকার ভারসাম্য পাওয়া যায়। শুধু ছুটির দিনগুলোতে (উইকএন্ড) কাজ করেই এক মাসের যাবতীয় খরচ চালানো সম্ভব, যা ইউকে বা কানাডার মতো দেশে প্রায় অসম্ভব। একটু হিসাব করে ও গুছিয়ে চললে নিজের অর্জিত আয়ের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সেভিংস করা সম্ভব হয়।
৩. আকর্ষণীয় মিনিমাম ওয়েজ: দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে ঘণ্টা প্রতি মিনিমাম ওয়েজ ১০ হাজার ৭০০ ওন (প্রায় ৮৬০ টাকা), যা ইউরোপের অনেক দেশের প্রায় সমান। এই চমৎকার মজুরির কারণে এখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের বেশ ভালো মূল্যায়ন পেয়ে থাকেন। ফলে মাত্র ১ বছর থাকার পর স্টুডেন্ট থাকা অবস্থাতেই একটি ভালো পরিমাণের টাকা সেভিংস করা সম্ভব হয়।
৪. ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে মুভ করার সুযোগ: কোরিয়া থেকে ইউরোপ বা বিশ্বের যে কোনো উন্নত দেশে মুভ করা তুলনামূলক অনেক সহজ ও ঝামেলাহীন। বাংলাদেশ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেই যেখানে ১–২ বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে কোরিয়া থেকে খুব কম সময়ে ও শিথিল রিকোয়ারমেন্টেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়। কোরিয়ায় ১ বছর পড়াশোনা বা মাস্টার্স শেষ করে অনেকেই সহজে জার্মানি, লিথুয়ানিয়া বা অন্যান্য দেশে স্টুডেন্ট কিংবা ওয়ার্ক ভিসায় চলে যাচ্ছেন।
৫. অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ও সেরা লাইফস্টাইল: এখানে আপনি পাবেন সুপারফাস্ট ইন্টারনেট, বিশ্বমানের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামাজিক নিরাপত্তা। পাবলিক প্লেসে কোনো কিছু হারিয়ে গেলেও তা অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত থাকে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং বা রিসার্চের স্টুডেন্টদের জন্য এখানকার আধুনিক ল্যাবরেটরি ও বিশ্বমানের প্রযুক্তি একদম আদর্শ।
৬. পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা শেখার সেরা প্ল্যাটফর্ম: কোরিয়ার স্টুডেন্ট লাইফ আপনাকে সময় এবং অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিখুঁতভাবে শিখিয়ে দেবে। পড়াশোনা, চাকরি আর নিজের রান্নাবান্না সামলে জীবনটা হয়তো কিছুটা রোলারকোস্টারের মতো মনে হতে পারে। তবে এই কঠিন পরিশ্রম আপনাকে ভবিষ্যতে ইউরোপ বা আমেরিকায় যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার শক্তি দেবে।
৭. সামাজিক নিয়ম ও পরিচ্ছন্নতা: কোরিয়া একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং কঠোরভাবে নিয়মশৃঙ্খলায় বাধ্য একটি উন্নত দেশ। এখানে প্রকাশ্যে ধূমপান করা, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করা বা পাবলিক প্লেসে উচ্চশব্দে কথা বলে অন্যের বিরক্তির কারণ হওয়া নিষেধ। এই সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ আপনাকেও একজন দায়িত্বশীল ও সভ্য নাগরিক হতে সাহায্য করবে।
বিদেশে সফলতার কোনো সহজ শর্টকাট নেই, একমাত্র শর্টকাট হচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন ‘হাড়ভাঙা পরিশ্রম’। কোরিয়ায় যে যত বেশি পরিশ্রম করবে, সে তত দ্রুত নিজের সুন্দর অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার- কোরিয়াতে কিছু শর্টকাট বা বিভ্রান্তিকর পথে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার সুযোগও আছে, সেসব থেকে সর্বদা দূরে থাকা উচিত।
কোরিয়ার স্টুডেন্ট লাইফ শেষে আপনি শুধুই একটি একাডেমি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরবেন না। সাথে নিয়ে ফিরবেন একজন হার্ডওয়ার্কিং, পাংচুয়াল এবং বিশ্বমানের সভ্য মানুষ হওয়ার অমূল্য অভিজ্ঞতা। নতুন এবং পরাতন সকলের স্টুডেন্ট লাইফের জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা।
এমআরএম