‘যে শিশু পৃথিবীর আলো দেখেছে আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’—জনপ্রিয় গানটিতে শিশুদের জন্য পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী করে তোলার কথা সুরে সুরে প্রকাশ পেয়েছে বহুবার। এই গানের কথাগুলো যাদের অন্তরে ধারণ করা উচিত; সেই রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আমরা কতটুকু দায়িত্ববান শিশুদের ব্যাপারে। শিশুদের জন্য প্রকৃতির বাইরে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে ও প্রদানে বেশ কিছু বৈষম্য রয়েই গেছে। সামাজিক বৈষম্যের শিকার এমন শিশুরা একাকী পথে-প্রান্তরে ঝড়-বৃষ্টির মাঝে খেয়ে, না খেয়ে রাত যাপন করে। এদের মধ্যে অনেকে পাগল, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অতি দরিদ্র—যারা সমাজে মানুষ হিসেবে পরিচিত। এই মানবসমাজে অবহেলিত মানুষগুলো কোনো ওভার ব্রিজের নিচে, রাস্তার ধারে, ট্রেন লাইন ও বাস স্টেশনে কিংবা হাটখোলায় কোনো ঘুপচি ঘরে বসবাস করে। আমরা যাদের টোকাই বা পথশিশু বলে থাকি।
আমাদের তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কাছে সৃষ্টির সেরা এই অবহেলিত মানুষগুলোর কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। নেই কোনো ভবিষ্যৎ। পথশিশুদের পারিবারিক কোনো বন্ধন নেই। বাবা-মায়ের যে স্নেহ-মমতায় বুক ভরে ওঠে কানায় কানায়, তা তাদের কপালে জোটে না। অভিভাবকহীন এসব শিশু তাই নিজের সিদ্ধান্তে জীবন চালাতে বাধ্য হয়। এসব শিশুকে নিয়ে করুণার নামে জঘন্য বিদ্রূপ চলে হরহামেশাই। পথের পাশে উদাম দেহে কুকুরের সাথে ওদের নির্মম বসবাসের ওইসব মুহূর্তগুলোর যেসব ছবি ফটোগ্রাফাররা তোলেন, সেটা নিয়ে প্রদর্শনী বা এক্সিবিশন হয় এবং আমরা সেগুলো বেশ টাকা খরচ করে দেখি এবং কিনেও আনি! আবার ঈদ কিংবা শীত এলে দেখি এসব শিশুর জন্য একদিনের ভালোবাসা প্রকাশে রাষ্ট্র কিংবা কিছু প্রতিষ্ঠান ফটোসেশনে ব্যস্ত হয়ে যায়। অসহায়দের মাঝে কম্বল বিতরণ, ঈদের পোশাক বিতরণের ছবি পত্রপত্রিকায় বা ফেসবুকে দেখি। মাঝে মাঝে ফটোগ্রাফাররা পুরস্কৃত হন কিন্তু পথের শিশুরা পথেই রয়ে যায়।
অপরদিকে সোস্যাল মিডিয়ায় এসব ছবি শেয়ার করে লাইক দিয়ে প্রদর্শন করা হয়। অনেকে আবার খুব কষ্ট পেয়েছেন বলে মন্তব্যও করেন। কিন্তু ধুলো মলিন এসব শিশুকে বুকে টেনে নিয়ে কেউ কি এক বেলা আহার করাচ্ছেন? তাহলে এসব প্রচারণা করে পথশিশুদের কী লাভ হচ্ছে? তাদের যাপিত জীবন আগেও কষ্টের মধ্যে ছিল, এখনো আছে। আমাদের সংবিধানে প্রত্যেকটি মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে। আর যাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পাওয়ার কথা ছিল, তারা হচ্ছেন মূলত উপেক্ষিত।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিসেফের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে রাস্তায় বসবাসকারী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন। তারা দারিদ্র্য, অপুষ্টি, রোগ, নিরক্ষরতা ও সহিংসতাসহ নানা বঞ্চনার শিকার। তাদের শোচনীয় এই পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে ‘বাংলাদেশে রাস্তার পরিস্থিতিতে শিশুরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। আমাদের দেশে যেসব শিশু রাস্তায় রয়েছে; তারা নানা সহিংসতায় বেড়ে উঠছে। এসব শিশুর জীবন উন্নয়নে শুধু সরকার নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থাকে। প্রতিবেদনে উঠে আসা এ বাস্তব চিত্র দেশের পথশিশুদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিমালা প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণে সহায়ক হবে।
আরও পড়ুনঘরে-বাইরে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার শিশু
ঢাকা এবং দেশের আটটি বিভাগের (যেসব স্থানে পথশিশুর আনাগোনা বেশি) ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর কাছে সরাসরি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জরিপে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশুদের মোট সংখ্যা না থাকলেও ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক হতে পারে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই শিশুদের বেশিরভাগই ছেলে (৮২ শতাংশ) এবং তাদের বেশিরভাগ দারিদ্র্যের কারণে বা কাজের সন্ধানে রাস্তায় আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ৬ শতাংশ শিশু এতিম অথবা তাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন কি না, তা তাদের জানা নেই।
জরিপে জানা যায়, এই শিশুদের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন (৩০ শতাংশের বেশি) জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন- ঘুমানোর জন্য বিছানা এবং নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায়, এমন একটি ঘর থেক বঞ্চিত। তারা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরো বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে। প্রায় ৭ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ একা ঘুমায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু কয়েক জন একসঙ্গে মিলে ঘুমানোর মাধ্যমে সুরক্ষা ও স্বস্তি খোঁজে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা তিনটি ঘটনার একটি (৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) রাতে তাদের ঘুমের সময় ঘটে থাকে।
রাস্তায় বসবাসকারী শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় পথচারীদের দ্বারা। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ, ভিক্ষাবৃত্তি বা চায়ের দোকানে, কারখানা ও ওয়ার্কশপে কাজ করতে বাধ্য হওয়া এই শিশুরা প্রতিদিন আঘাত ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ শিশু কাজ করার সময় আহত হওয়ার কথা জানায়, আর অর্ধেক শিশু জানায় সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা। রাস্তায় থাকা শিশুদের প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন (৭১ দশমিক ৮ শতাংশ) পড়তে বা লিখতে পারে না, যা জীবনভর তাদের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে যায় এবং তাদের নির্মম ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়।
আরও পড়ুননারী শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে
জরিপ থেকে আরও জানা যায়, রাস্তায় থাকা শিশুদের সেবা প্রদান করে এমন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তারা যে সহায়তা পেতে পারে, সে সম্পর্কে বেশিরভাগ শিশুই (৭৯ শতাংশ) অবগত ছিল না। এসব পথশিশুর উন্নয়নকার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শুরু হোক আমাদের সুন্দর বাংলাদেশের বাস্তবিক কার্যক্রম। আর এ কাজে শামিল হতে হবে সর্বস্তরের মানুষকে। কিশোর, যুবক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী সবাইকে। যারা আর্থিক সহায়তা দিতে অক্ষম; তারা অন্তত ভালোবাসার চাদর দিয়ে মুড়িয়ে দেবে এসব শিশুকে। বিত্তশালীদের তো কথাই নেই। তাহলেই হয়তো পথশিশুরাই হবে পথের হাসি।
এসইউ