নাজিফা রাসেল স্বপ্না
অনামিকা ঘরের কোণে কাঠের পুরোনো আলমারিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর তার বিয়ে। ড্রয়ার খুলে সে একে একে সাজিয়ে রাখছিল তার জন্য কেনা নতুন গহনার বাক্সগুলো—চকচকে সোনার চেইন, কারুকার্য করা কানের দুল, আর ভারী একটা সীতাহার। বিকেলে সূর্যের নরম আলো গহনাগুলোর ওপর পড়ে যেন একটা রাজকীয় দীপ্তি ছড়াচ্ছিল।
অনামিকার চোখ আটকে গেল আলমারির একেবারে পেছনের একটা ছোট্ট কাঠের বাক্সে। বাক্সে কোনো তালা নেই, কেবল সামান্য ধুলো জমেছে। অনামিকা বাক্সটা সাবধানে বের করে খুলল। ভেতরে রয়েছে একটি সাধারণ, সামান্য রুপালি আভা হারানো রুপার তোড়া আর একজোড়া চিকন নকশাকাটা বালা।
‘ওটা দেখছিস?’ দরজার কাছ থেকে মৃদু স্বর ভেসে এলো। অনামিকা তাকিয়ে দেখে তার ঠাকুমা সরলা দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে এক চিলতে অমলিন হাসি।
অনামিকা গহনা দুটো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ঠাকুমা, নতুন এত সোনার গহনা থাকতে তুমি এই পুরোনো বাক্সে হালকা রুপার জিনিসগুলো কেন আলাদা করে রেখেছো?’
তুমি চলে যাও তোমার সময় হয়ে গেছে
ঠাকুমা ধীরে ধীরে এসে অনামিকার পাশে বসলেন। হাত বাড়িয়ে রুপার বালা দুটো স্পর্শ করে বললেন, ‘এই সোনার জিনিসগুলো তো তোদের আজকের প্রাচুর্যের কথা বলে অনামিকা। এই সামান্য রুপার জিনিসগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে সত্যিকারের ভালোবাসা আর ত্যাগের এক বিরাট গল্প।’
অনামিকা উৎসুক চোখে তাকাল। ঠাকুমা বলতে শুরু করলেন—‘তখন আমাদের বিয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। তোর দাদু একটা ছোট্ট প্রেসের দোকানে কাজ করতেন। সংসার কোনোমতে চলত। কিন্তু ভালোবাসা আর আদরের কোনো অভাব ছিল না। হঠাৎ এক শীতে দাদুর খুব শক্ত অসুখ হলো। ডাক্তার বললেন, জরুরি চিকিৎসা আর ওষুধ না হলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু তখন আমাদের হাতে একটা টাকাও বাড়তি ছিল না। গৃহস্থের কাছে হাত পাতার মতো আত্মসম্মান তোর দাদুর ছিল না। আর আমার কাছেও কোনো সঞ্চয় ছিল না।’
ঠাকুমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন, ‘আমার বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া একমাত্র মূল্যবান গহনা বলতে ছিল একটা ভারী সোনার কানের পাশা। আমি কাউকে না জানিয়ে লুকিয়ে বাজারে গিয়ে ওটা বিক্রি করে দিলাম। সেই টাকায় তোর দাদুর চিকিৎসা হলো, তিনি ভালো হয়ে উঠলেন। কিন্তু কানের পাশাটা হারিয়ে যাওয়ার কথা জেনে তোর দাদু খুব কেঁদেছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার জীবনের বিনিময়ে তোমার বিয়ের গহনা আমি কেড়ে নিলাম।’ আমি হেসে বলেছিলাম, ‘তুমি ভালো আছ, এরচেয়ে বড় গহনা আমার আর কী হতে পারে?’
আরও পড়ুনপ্রেম যমুনার ঘাটে সে আসবেই
ঠাকুমার চোখের কোণে একফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল—‘তার ঠিক দুই বছর পর, নিজের কষ্টের জমানো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তোর দাদু আমার জন্য এই রুপার বালা আর তোড়াটা গড়িয়ে এনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি সোনার বদলে রুপা কিছুই না কিন্তু এর প্রতিটা নকশায় আমার কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা খোদাই করা আছে।’ সেদিন থেকে আমার কাছে পৃথিবীর সব সোনার গহনার চেয়েও এই রুপার বালা দুটো অনেক বেশি মূল্যবান।’
অনামিকা বাক্সের দিকে তাকাল। যে রুপার বালা দুটোকে একটু আগেও তার খুব সাধারণ আর মলিন মনে হচ্ছিল; ঠাকুমার গল্পের পর সেগুলোর ভেতর থেকে যেন এক অপূর্ব উজ্জ্বলতা ঠিকরে বেরোচ্ছে।
সে তার নতুন সোনার সীতাহারটার পাশে ঠাকুমার দেওয়া পুরোনো রুপার বালা দুটো খুব সযত্নে রাখল। অনামিকা বুঝতে পারল—গহনার আসল দাম সোনা বা রুপার ওজনে হয় না, তার আসল দাম লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গভীরতায়।
এসইউ