ফেনীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সদস্য আবদুল মোতালেবকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটি ও মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটিতে সদস্য করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন পদধারী নেতাকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দুটি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা চলছে। তবে আবদুল মোতালেবের দাবি, তিনি কোনো কমিটিতে সদস্য হওয়ার জন্য তদবির করেননি।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের তদারকিতে গঠিত জেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটি এবং মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটিতে আবদুল মোতালেবকে সদস্য করা হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। আর মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটি মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও সংশ্লিষ্ট আপিলের বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্ব পালন করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আবদুল মোতালেব ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির ৫১ নম্বর সদস্য। পাশাপাশি তিনি ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের সদস্যসচিব এবং জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন নেতাকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছেন, তা তদন্তের দাবিও জানান।

রামপুর সৈয়দ বাড়ির বাসিন্দা সৈয়দ আকরাম ফেসবুকে লিখেছেন, এই ভদ্রলোক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেনী পাইলট হাই স্কুলের ১২৫ বছর উদযাপনের অর্থ কমিটির আহ্বায়ক থাকা অবস্থায় পাওনাদের টাকা না দিয়ে টাকা মেরে দিয়ে কক্সবাজার চলে গেছে। আমিও ৪৫ হাজার টাকা পাই।

মো. নুরুজ্জামান মানিক একজন লিখেছেন, বিএনপির নেতারা সহজে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে অতীত ভুলে যায়, যে রামপুর ৯৫% বিএনপির এলাকা, সে রামপুরে গত ১৭ বছর আওয়ামীদের সবচেয়ে ধনী নেতাদের জন্ম হয়েছে, একই ধনী গুলা এখন বিএনপির সাথে।

ফেনী জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট শহীদুল আলম ইমরান তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল মোতালেবকে সম্প্রতি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

ফেনী পৌর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভুঁইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আবদুল মোতালেবকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির সদস্য করা হয়েছে। সরকারের অভ্যন্তর থেকে কারা সরকারকে বিতর্কিত করছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘সরকার ঘোষিত রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির ৫১ নম্বর সদস্য আবদুল মোতালেবকে সম্প্রতি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এর দায় কার?’

এ বিষয়ে আবদুল মোতালেব বলেন, ‘আমি কোথাও সদস্য হওয়ার জন্য তদবির করিনি। প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি কমিটির বিষয়ে আমি জানি না কে বা কারা আমার নাম দিয়েছে। আমি সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, সেই হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা আপিল কমিটিতে থাকতেই পারি।’

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন আপিল কমিটিতে আবদুল মোতালেবকে সদস্য করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধ ছিল।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবদিনের অনুরোধের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা আপিল কমিটিতে আবদুল মোতালেবকে সদস্য করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির সদস্যসহ অন্য পদগুলোতে তাকে নিয়ে যেহেতু সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেক্ষেত্রে তাকে বাদ দেওয়া যেতে পারে।’

প্রসঙ্গত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নের জন্য চলতি বছর জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত নীতিমালায়ও পরিবর্তন এনে বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’র পরিবর্তে বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির বিধান করা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে আবদুল মোতালেবকে এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/কেএইচকে/জেআইএম