ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতাকে ধরা হয় ইউরোপের সেরাদের আসর। চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ থেকে শুরু করে ইউরোপা কনফারেন্স লিগ—যে টুর্নামেন্টই ধরা হোক না কেন, ইউরোপিয়ান লিগের সেরা দলগুলোই লড়াই করে জায়গা করে নেয় সেখানে। সেই কমপিটিশনে জায়গা করে নিচ্ছে দ্বিতীয় বিভাগে থাকা এক দল? যেখানে নিয়মিত জায়গা করে নেয় ইউরোপের এলিটরা।
বলছি পর্তুগিজ ক্লাব ‘তোরেইনজ’-এর কথা। নামটা খুব একটা পরিচিত ঠেকবে না। খোদ পর্তুগিজ ফুটবল ফলো করা সমর্থকদের কাছেও খুব একটা পরিচিত নাম না এটি। কারণ, পর্তুগিজ লিগ দূরে থাক, তারা আজীবন ঘুরপাক খেয়েছে দ্বিতীয় আর তৃতীয় বিভাগে। সেই ১৯৯১-৯২ মৌসুমে শেষবার পর্তুগিজ লিগ খেলেছিল দলটি। এর পর থেকে তাদের খুঁজেও পাওয়া যায়নি পর্তুগালের শীর্ষ লিগে। হঠাৎ এই নাম আলোচনায় কেন? কারণ, ১০৯ বছর পুরোনো ক্লাবটি শুধু অসম্ভবকে সম্ভব করেনি, পর্তুগালের সবচেয়ে প্রাচীন শিরোপা জিতে টিকিট কেটেছে ইউরোপের। সেটাও দ্বিতীয় বিভাগ থেকে এসে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ কোথায় বাস করেতাসা দে পর্তুগালে শিরোপা জয়
তাসা দে পর্তুগালকে ধরা হয় পর্তুগালের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা। অনেকটা লা লিগার কোপা দেল রে কিংবা ইংলিশ লিগের এফএ কাপের মতো, যেখানে দেশের প্রতিটি ক্লাব সমান সুযোগ পায় শিরোপা জেতার। প্রতিবছর পর্তুগালের মোট ১৪৯টি ক্লাব নিয়ে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় তাসা দে পর্তুগাল, যেখানে সুযোগ পায় শীর্ষ লিগ থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে খেলা প্রতিটি দল।
১০৯ বছরের ইতিহাসে এটিই তাদের সর্বোচ্চ অর্জন।এবারের তাসা দে পর্তুগাল চমকে দিয়েছিল অনেককেই। কারণ, সেমিফাইনালে সুযোগ পাওয়া চার দলের দুইটি ছিল পোর্তো আর স্পোর্টিং লিসবন, পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা দুই দল। আর বাকি দুইটি ছিল দ্বিতীয় আর তৃতীয় বিভাগ থেকে উঠে আসা তোরেইনজ ও ফাফে। দুই লেগের সেমিফাইনালে ফাফেকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে তোরেইনজ।
ফাইনালে মুখোমুখি স্পোর্টিংয়ের। কাগজে-কলমে তাদের ফাইনালে দাঁড়াতে পারারই কথা নয়। কিন্তু ফাইনালের নার্ভ যেন বদলে দিয়েছিল চিত্র। পর্তুগালের জাতীয় স্টেডিয়ামে খেলতে নেমে যেন খেই হারিয়ে ফেলেছিল স্পোর্টিং সিপি। ৪ মিনিটেই তোরেইনজকে এগিয়ে নিয়ে যান কেভিন জোহি। ৫৪ মিনিটে কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজের গোলে সমতায় ফেরে স্পোর্টিং, ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই ভুল করে বসে স্পোর্টিং, পেনাল্টি বক্সে দিয়ে বসে পেনাল্টি। সেখান থেকেই ১১৩ মিনিটে জয়সূচক গোল করেন স্টোপিয়া।
দল না পাওয়া সেই দিওমান্দে কীভাবে রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হলেনস্টোপিয়া শুধু গোল করে শিরোপাই জেতাননি, তোরেইনজের নাম নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপে। কেপ ভার্দের হয়ে বিশ্বকাপে রাঙিয়েছেন, সঙ্গে তোরেইনজের নামও। ক্লাবের ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তাঁর নাম ঘোষণার দিন বিশাল আয়োজন করেছিল ক্লাব।
কেপ ভার্দের স্টোপিয়ার গোলে শিরোপা জিতেছে তোরেইনজ।ব্যস, ২-১ গোলে জিতেই প্রথমবারের মতো তাসা দে পর্তুগাল উঁচিয়ে ধরে তোরেইনজ। প্রথমবারের মতো পর্তুগালের শীর্ষ শিরোপার স্বাদ পেল তারা। এর আগেও একবার করে দ্বিতীয় আর তৃতীয় বিভাগের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল তারা। কিন্তু পর্তুগালের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপার উদ্যাপন ছাড়িয়ে গিয়েছে সবকিছুকে। সেই সঙ্গে সেই দিনই নিশ্চিত করে ইউরোপা লিগে নিজেদের টিকিট। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী লিগ কাপ জয়ী দল সরাসরি সুযোগ পাবে ইউরোপের দ্বিতীয় মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি ইউরোপা লিগে।
ভিনিসিয়ুস কি রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়বেনপ্রথম বিভাগের পরীক্ষায় ব্যর্থ
ইউরোপা লিগে সুযোগ পেলেও তখনো একটা লড়াই বাকি ছিল তাদের। সেটা প্রথম বিভাগে ওঠার লড়াই। শিরোপা জিতলে কী হবে, প্রথম বিভাগে যাওয়া তখনো নিশ্চিত হয়নি। ৩৪ ম্যাচ শেষে ৫৯ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থেকে লিগ শেষ করেছিল তোরেইনজ। ফলে পরবর্তী মৌসুমে প্রথম বিভাগে খেলতে চাইলে খেলতে হবে প্লে-অফ রাউন্ড। সেখানেই তাদের মুখোমুখি হয়েছিল প্রথম বিভাগে ১৬তম অবস্থানে থাকা কাসা পিয়া। দুই লেগের ফাইনাল উতরাতে পারেনি তারা। ২-০ ব্যবধানে হেরে আবারও দ্বিতীয় বিভাগেই থাকতে হচ্ছে তাদের। ৩৪ বছর পর পর্তুগিজ লিগের প্রথম বিভাগে খেলার স্বপ্নটা স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল।
প্রথম বিভাগে ওঠা হয়নি তাদের। বিশ্বকাপ থেকে বড় ক্লাবে সুযোগ পেয়েছেন যে খেলোয়াড়েরাবদলাতে হবে নিজেদের স্টেডিয়াম
প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ না হলেও ইউরোপের টিকিট তাদের নিশ্চিত। তারা টিকিট কাটায় উল্টো মাথায় হাত পর্তুগালের আরেক জনপ্রিয় ক্লাব বেনফিকার। পুরো মৌসুম অপরাজিত থেকেও জোসে মোরিনহোর ছেড়ে আসা দল সরাসরি যেতে পারছে না ইউরোপা লিগে। বরং তাদের বাছাইপর্ব খেলে নিশ্চিত করতে হবে ইউরোপের টিকিট।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে সরাসরি ইউরোপের টিকিট কাটা দলটিকে খুঁজতে হচ্ছে নতুন মাঠ। কারণ, তাদের ম্যানুয়াল মার্কেজ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ৪৩১ জন। এই মাঠ ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড দূরে থাক, পর্তুগিজ প্রথম বিভাগের নিয়মও উতরাতে পারবে না। ফলে অন্য কোনো স্টেডিয়ামেই শুরু হতে যাচ্ছে তাদের ইউরোপিয়ান যাত্রা। তবে যে মাঠেই হোক না কেন, ইউরোপের যে মঞ্চে লড়ছে এসি মিলান, জুভেন্টাস, বায়ার লেভারকুসেন, রেঞ্জার্সের মতো দল, সেখানে দ্বিতীয় বিভাগের দলটির নাম উচ্চারণ হওয়ার মতো গর্বের আর কী আছে!
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দের কাবরালের গোলটিই বিশ্বকাপের সেরা গোল